শনিবার, অক্টোবর ১, ২০২২

ইতিহাস-ঐতিহ্যে কেন্দুয়ার পাঁচপীরের কান্দা ও কবি কঙ্ক

রাখাল বিশ্বাস, কেন্দুয়া প্রতিনিধি

- Advertisement -

নেত্রকোনার কেন্দুয়া সদর হতে মাত্র ৩ কিমি উত্তরে সেনের বাজার সংলগ্ন একটি সবুজেঘেরা গ্রাম বিপ্রবর্গ। এই গ্রামে মধ্যযুগে জন্মে ছিলেন “বিদ্যাসুন্দর” গ্রন্থ নামে সত্যপীরের পাঁচালী লেখক কবি কঙ্ক।
উপমহাদেশের প্রখ্যাত লোকঐতিহ্য সংগ্রাহক চন্দ্রকুমার দে’র সংগ্রহিত কাহিনী এবং ড.দীনেশ চন্দ্র সেন মহাশয় সম্পাদিত “মৈমনসিংহ গীতিকায় গ্রন্থিত ‘কঙ্ক-লীলা’কাহিনীর অবিচ্ছেদ্য অংশ হচ্ছে কান্দাপাড়া গ্রামের ঐতিহ্যবাহী পাঁচপীরের কান্দা এবং যবনপীরের আস্তানা।
এখানে এখন দৃশ্যমান উঁচুস্থানে সবুজেঘেরা বিশাল খেলার মাঠ,ঈদগাহ এবং একটি মসজিদ। মধ্যযুগে পাঁচপীরের এই কান্দায় প্রধান পীর যবনপীর সাহেবের বসার জন্য স্থাপিত প্রায় ৩ফুট দৈর্ঘ, দেড় ফুট প্রস্ত এবং ১ফুট উচ্চতার একটি কালো রঙের পাথর।

- Advertisement -

পরবর্তী কোন এক সময় হতে এলাকার মানুষ ঐ কামেল পীরের নামে মানত করতেন।মানতকারীগণ ভক্তিসহকারে ফুল দিতেন,কেউ কেউ মানতের সফলতায় ভক্তি করে শিন্নি পায়েশ বিলাতেন এবং ধ্যানভক্তি করতেন বলেও জানা যায়।
রোববার ৩জুলাই/২২ইং সরেজমিনে গেলে এলাকার মানুষ জানান, এটি গুনাহের কাজ মনে করে অনুমান দুই হাজার সনের দিকে কে বা কাহারা রাতের আঁধারে পাথরটি চুরি করে নিয়ে যায়। পরে আর পাথরটির সন্ধান পাওয়া যায়নি।
চন্দ্রকুমারদে সংগ্রহীত আখ্যান থেকে জানা যায়, মধ্যযুগে ইসলাম প্রচারে যবনপীর নামে একজন আধ্যাত্নিক পীর চারজন সঙ্গী নিয়ে স্রুতশ্বিনী রাজ রাজেশ্বরী নদীবিধৌত এলাকার সবুজ বন-বনানীতে ঘেরা হিন্দুজনবসতিপূর্ণ গ্রাম বিপ্রবর্গ সংলগ্ন কান্দাপাড়া গ্রামের উঁচুভিটায় বটবৃক্ষের নীচে আস্তানা গাড়েন।
তিনি কামেল পীর হিসেবে অল্প দিনেই এলাকার মানুষের কাছে ব্যাপক সুনাম অর্জন করেন। পীরের কাছে মানুষ এসে যে কোন সমস্যায় মানত করলে সমাধান হতো। ফলে মানুষের উপকারের কথা দ্রুত চাউর হতে থাকায় পাঁচপীরের জনপ্রিয়তা দিন দিন বৃদ্ধি পেতে থাকে।
সেই থেকে এই জায়গাটিকে পাঁচপীরের কান্দা হিসেবে মানুষ আখ্যায়িত করেন।
এদিকে পীর সাহেবের আধ্যাত্মিক কান্ডে মুগ্ধ হয়ে পাশ্ববর্তী বিপ্রবর্গ গ্রামের গর্গাশ্রম প্রতিষ্ঠাতা গর্গ পন্ডিতের (গোঁসাই) পালিত পুত্র (গোঁসাই কন্যা লীলাদেবীর প্রেমিক) কবি কঙ্ক পীরের আস্তানায় আসা যাওয়া করেন। পীর সাহেবও কঙ্ককে অত্যাধিক আদর স্নেহ করেন। এক সময় কঙ্ক পীরের কাছে দীক্ষা গ্রহন করেন।

★”জহুরী জহর চিনে বানিয়া চিনে সোনা
পীর পয়গাম্বর চিনে সাধু কোন্ জনা।
পীরের অদ্ভুত কান্ড সকলি দেখিয়া
কঙ্কের পরান গেলো মোহিত হইয়া”।
ভক্তি মুক্তি তন্ত্র-মন্ত্র দেহ প্রাণ মন
সকলি গুরুর পদে করলো সমর্পণ।
গুরুতে বিশ্বাস যার গুরু ইস্ট ধন
দামোদর দাসে কয় এই ভক্তের লক্ষণ”।
আশ্রমবাসী হয়ে কঙ্ক পীরের কাছে দীক্ষা নিয়েছে!
বিষটি জানতে পেরে ব্রাহ্মণ সমাজ ক্ষিপ্ত হয়ে আশ্রমাচার্য্য গর্গ গোঁসাইকে হুকুম করেন- জাতি ভ্রষ্ঠ কঙ্ককে আশ্রম ত্যাগ করতে হবে।
এ অবস্থায় একদিন সমাজপতি গর্গপন্ডিতকে বলেন-কঙ্কের সাথে প্রেম করায় তোমার কন্যা লীলা কলঙ্কিনী হয়েছে। তাই সমাজের বিধানে তোমার মেয়ে লীলাকেই ভাতে বিষ মিশিয়ে কঙ্ককে খাইয়ে হত্যা করতে হবে। আর সেই বিষ তোমাকে এনে নিজ হাতে কন্যার হাতে তুলে দিতে হবে।
পরিস্থিতি এমন পর্যায় হলো যে গর্গগোঁসাই সেই বিধান মানতে বাধ্য হলেন।

- Advertisement -

এ কথা শুনিয়া লীলা ক্রন্দন করত: বলছে-
★”আজি হতে মন আমার হইল বিকল
কঙ্ক ছাড়া এই জীবন হইবে বিফল”।
এদিকে সমাজের হীনলোকেরা অপপ্রচার চালাতে লাগলো গোঁসাইকন্যা লীলা কঙ্কের প্রেমে কলঙ্কিনী হয়েছে।কারণ, কঙ্ক এখন আর হিন্দু নয়,সে জাত দিয়ে মুসলমান হয়েছে। ইত্যাদি কথা শুনে ব্যথিত কন্ঠে লীলা যাকেই পায় তাকেই বলে একথা মিথ্য।
* “মিথ্যা বদনাম তারা দিল রটাইয়া
কলঙ্কিনী হইয়াছে লীলা কুল ভাঙ্গাইয়া।
একে তো কুমারী কন্যা অতি শুদ্ধমতি
কলঙ্ক রটাইল তার যত দুষ্টমতি”।

চলবে…

- Advertisement -

আরো পড়ুন:ইসলামপুর চরপুটিমারী ইউনিয়নে ভিজিএফ চাল বিতরণের উদ্বোধন

- Advertisement -
এই জাতীয় আরও সংবাদ
- Advertisment -

জনপ্রিয় সংবাদ