শনিবার, অক্টোবর ১, ২০২২

জফরপুর প্রাচীণ খোজারদীঘি

রাখাল বিশ্বাস

- Advertisement -

১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে এই অঞ্চলে এক ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়েছিল। সেই ভূমিকম্পের কারণে ব্রহ্মপুত্র নদের গতিপথ পরিবর্তন হয়। ওই ভূমিকম্পের ফলে জফরপুর খোজারবাড়িসহ খোজার মসজিদটি মারাত্মক ধ্বংশপ্রাপ্ত হয়। এমনকি খোজারদীঘিটিও তার নব্যতা হারিয়ে ফেলে। তবে অলৌকিক ভাবে রক্ষা পায় দীঘিরপাড়। ভূমিকম্পে ধ্বংশ হওয়ার চিহ্ন হিসেবে আজও জঙ্গলের মধ্যে মাটি খুঁড়লে ঐ সব মোটা সিক-ছার,মাটির ভাঙ্গা কলসির অংশ,কলোপাথর,ভাঙা লাল চ্যাপ্টা ইটসহ বিভিন্ন আলামত পাওয়া যায়।

- Advertisement -

স্থানীয়রা যা বলেন:- ২০২০ সনের ৯ এপ্রিল খোজারদীঘি নিয়ে কথা হয় কান্দিউড়া ইউনিয়নের জালালপুর গ্রামের ৬০ দশকের ইউনিয়ন বোর্ড সদস্য (বর্তমানে প্রয়াত) আব্দুল জব্বার মেম্বার মহোদয়ের সাথে। তিনি বলেন, আমরা ছোটবেলায় প্রবীণদের মুখে শুনেছি সম্রাট আকবর মহলে জাফর নামে একজন খোজা (নপুংশক) মানুষ ছিলেন। তিনি মহলের সকলের-বিশেষ করে বেগম মহলের প্রিয় ছিলেন। খোজার ইচ্ছায় এবং বেগমের ইচ্ছা পূরণে সম্রাট জাহাঙ্গীর এই ইকলিম মোয়াজ্জেমাবাদ পরগনায় তখন খোজার দীঘি,খোজার বাড়ি এবং খোজার মসজিদ নির্মাণ করে দিয়ে ছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল, মানুষ যেনো ওই খোজাকে সর্বদায় মনে রাখেন। তিনি আরও বলেন, দীঘিটি এখন শুকিয়ে যায়। কিন্তু তখন সারা বছরই দীঘিতে পানি থৈ থৈ করতো। বিভিন্ন এলাকা থেকে এক সময় দর্শনার্থী আসতেন দীঘিটি দেখার জন্য। এখানের সহজ-সরল মানুষদের সাথে দর্শনার্থীদের কথা হতো। তারা চেষ্টা করতেন দীঘির ইতিহাস জানতে।

গত ১২ এপ্রিল/২০২১সনে পূণর্বার সরেজমিনে গেলে কথা হয় জফরপুর গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি সামছুদ্দিন মল্লিক,ফজলুর রহমান,আজহারুল ইসলাম,হাবিব মিয়া,এমদাদুল হক,আব্দুস সাত্তার,কুন্ডুলী গ্রামের সন্তোষ মিয়া,আসাদুল হক প্রমূখ জনের সাথে। তারা জানান, খোজারদীঘি, খোজারবাড়িসহ বিশাল ভূমির বর্তমান মালিক গ্রামের দুই শতাধিক পরিবার। তারা বন্দোবস্ত করে নিয়েছেন। এর মধ্যে বিতর্ক থাকলেও যারা মালিকানা দাবী করে আসছেন-তারাই ভোগ করছেন। খোজার এই দীঘিতে চৈত্র মাসেও প্রচুর পানি থাকতো। এক সময় গ্রামের মানুষ পলো দিয়ে মাছধরা উৎসব করতেন।

- Advertisement -

প্রবীণ সামছুদ্দিন মল্লিক বলেন-খোজার সময়টিতে প্রায় জন-মানব শূন্য এলাকাটিতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য দীঘির চতুর পাড়ে বসতি স্থাপন করতে বিভিন্ন অঞ্চল হতে অসহায় ও দরিদ্র্য মানুষদের এনে তিনি বাড়িঘর নির্মাণ করে দিয়ে ছিলেন। সামছুদ্দিন মল্লিক আরও জানান, দীঘিটির উত্তর পাড়ে অর্ধ্বশতাধিক জেলে সম্প্রদায়,পূর্বপাড়ে অর্ধ্বশতাধিক পাল,ধোপা ও নরসুন্দর সম্প্রদায়,দক্ষিণ পাড়ে ত্রিশ/চল্লিশ ঘর দেবনাথ ও কুমার সম্প্রদায় এবং পশ্চিম পাড়ে বিশ/ত্রিশ ঘর কামার ও কুমার সম্প্রদায়ের বসতি ছিল। এখন তাদের বংশধরদের তেমন কেউ আর এখানে নেই।
তিনি আরও জানান,খোজারবাড়ির উত্তরাংশে তারাদীঘি নামে আরও একটি দীঘি ছিল যা জৌলুশহীন ভাবে এখনও আছে।এক সময় তারাদীঘি পাড়ার রমেশচন্দ্র পাল,হর্ষচন্দ্র পাল, তারা দীর্ঘদিন পর্যন্ত খোজার এলাকাটির মালিকানা নিয়ে দায়িত্ব পালন করতেন। পরবর্তিতে মুসলীমগণ দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সেই থেকে এলাকাটিতে মুসলমানদের আধিপত্য স্থাপন হয়।
খোজারদীঘির ঈদগাহ্ মাঠে-জফরপুর,বেজগাতি,কুন্ডুলী ও ব্রাহ্মনজাতকে নিয়ে চার পাড়ার একসমাজ ছিল। উক্ত চার পাড়ার (বর্তমানে ৪ গ্রাম) মানুষ এক পাঞ্চাত হিসেবে উক্ত ঈদগাহ্ মাঠে ঈদের নামাজ পড়তেন।

সামছুদ্দিন মল্লিক বলেন,১৯৬২ সনে আর.ও.আর মূলে এবং ১৯৬৪ সনে এতত সংক্রান্ত মালিকানা বন্দোবস্ত দলিল হয়। তিনি বলেন- এখানে নওপাড়ার প্রফুল্ল চন্দ্র পালের নামে ১০ আনা অংশ ছিল। তার মধ্যে পশ্চিমাংশে ৫ আনা অংশ ক্রয় করেন হায়দার আলী,ইসব আলী গং, পূর্র্বাংশে ফিরুজ আলী ও আকবর আলী গং। বাকী ৫ আনা অংশ আব্দুল মজিদ গং ক্রয় করেন। তখন থেকেই ব্যাক্তি মালিকানায় এখানে মাছ চাষসহ ধান চাষাবাদ হচ্ছে। বিশাল এই খোজারদীঘিটিতে ছোট ছোট আরও কয়েকটি পুকুর খনন করে তাতে মাছ চাষ করেন মালিকদের কেউ কেউ।
স্থানীয় কারো কারো মন্তব্য হলো, কুন্ডুলী জামতলা হতে প্রায় দেড় কিমি কাঁচা রাস্তা পাকা করে ইতিহাস-ঐতিহ্য বিবেচনায় নিয়ে সরকারি ভাবে যদি রক্ষণা-বেক্ষণের মাধ্যমে পর্যটন কেন্দ্র বা পার্ক-মিউজিয়াম করে নিদর্শন পুনোরুজীবিত করা যেতো তা হলে নতুন প্রজন্মসহ সকলেই এই প্রাচীণ ঐতিহ্যটি সম্পর্কে জানতে পারতেন এবং দেশের গুণীজন ও পর্যটকদের আনা-গোনায় এলাকাটিও সমবৃদ্ধ হতো।

- Advertisement -

আরও পড়ুন: কেন্দুয়াকে ভূমিহীন ও গৃহহীনমুক্ত ঘোষণার লক্ষ্যে যৌথ সভা

- Advertisement -
এই জাতীয় আরও সংবাদ
- Advertisment -

জনপ্রিয় সংবাদ