সোমবার, আগস্ট ১৫, ২০২২

দুর্গাপুরে বন্যায় প্রায় ১০০ কোটি টাকার ক্ষতি

কলিহাসান,দুর্গাপুর(নেত্রকোণা)প্রতিনিধি:

- Advertisement -

নেত্রকোণার দুর্গাপুরে বন্যার সার্বিক পরিস্থিতি পরিবর্তিত রয়েছে। সোমেশ^রী ও
নেতাই নদীর পানি এখন আর আগের মতো নেই। তবে উপজেলার গাঁওকান্দিয়া,
কাকৈরগড়া ও বাকলেজাড়া ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল এলাকা থেকে পানি এখনো নামছে না।
অন্যদিকে বন্যাকবলিত কোনো কোনো স্থান থেকে পানি নেমে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্থ
স্থানগুলো ভেসে উঠছে। উপজেলা বিভিন্ন দপ্তর বন্যায় ক্ষতির পরিমাণ নিরুপণ করতে মাঠে
কাজ করছেন জানান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

- Advertisement -

উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে গত ১৫দিন ধরে উপজেলার ৭টি ইউনিয়ন ও ১টি
পৌরসভায় বন্যা দেখা দেয়। বন্যায় কৃষি, মৎস্য,স্বাস্থ্য,প্রাণিসম্পদ,বিদ্যুৎ,জনস্বাস্থ্য,রাস্তাঘাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১০০
কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা প্রাথমিকভাবে
ধারণা করছেন। প্রতিদিনই সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে ক্ষয়ক্ষতির হিসাব হালনাগাদ
করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন পাঠানো হচ্ছে বলে জানা যায়।

উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর(এলজিইডি) কর্মকর্তা মো. খোয়াজুর রহমান
জানান, ৪১.৮৮ কিলোমিটার রাস্তা ও বেশক’টি ব্রিজ ও কালভার্ট বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ
হয়েছে। উপজেলার আঞ্চলিক সড়ক মেরামতে ৭ কোটি ২৬লাখ ৫০ হাজার টাকা লাগতে পারে।
কাকৈরগড়া ইউনিয়নের গোদারিয়া ব্রিজ,চন্ডিগড় ইউনিয়নের ফেচিয়া গ্রামের ধসে
যাওয়া ব্রিজ, গাঁওকান্দিয়া ইউনিয়নে হেলে পড়া একটি ব্রিজ, বিরিশিরি ইউনিয়নের
হারিয়াউন্দ গ্রামের ধসে পড়া ব্রিজ সহ ৪টি ব্রিজের জন্য ২০কোটি ১০ লাখ টাকা
প্রয়োজন হতে পারে বলে সড়ক ও জনপদ(সওজ) নির্বাহী প্রকৌশলী শাহরিয়ার শরীফ খান ।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মাহবুবুর রহমান জানান, বন্যায় ৪৫ হেক্টর জমির শাক-
সবজি নষ্ট হয়েছে। আউশ ধান ৪০ হেক্টর জমির ধান ও ৫হেক্টর জমিতে রোপণকৃত পাট
পানিতে তলিয়ে যায়। তবে তেমন কোন ক্ষতি হয়নি। ৪০ হেক্টর বীজতলা পানিতে তলিয়ে
গেছে। নষ্ট হয়ে যাওয়া শাক-সবজি ক্ষতির পরিমাণ ১০ লাখ টাকার মতো হতে পারে বলে
তিনি ধারণা করছেন।

- Advertisement -

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. শিমু দাস জানান, বন্যায় পশু সম্পদ, গবাদী পশু-
মহিষ, হাস-মুরগি, ছাগল-বেড়া প্রতিষেদক টিকা প্রদান করা হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে
টিম ওয়ারি কাজ চলমান রয়েছে। ক্ষতির পরিমাণ আগামী সপ্তাহের মধ্যে নিরুপণ করা
সম্ভব হবে।

উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সুমন কুন্ডু জানান, ৬ হাজার পুকুর (দীঘি) ও ১৫০-২০০ মৎস্য
খামার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এতে ২৫-৩০ হাজার মে.টন মাছ পানিতে ভেসে গেছে।
৬হাজার ২শ মালিকের ২-৩ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে।
উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল কর্মকর্তা মো.আশরাফুজ্জামান জানান,উপজেলার সবকটি
ইউনিয়নে লোকজন পানিবন্দি অবস্থায় ছিলেন। পানিবন্দি থাকা অবস্থায় উপচে পড়া
টিউবওয়েল গুলোর পরিবারকে বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ করা হয়েছে। সার্বক্ষণিক খোঁজ
খবর নেয়া হয়েছে। উপজেলার প্রায় ৩শ টিউবওয়েলের প্লাটফর্ম ভেঙে গেছে। প্রতিটি
প্লাটফর্ম ভেঙে যাওয়া মেরামত করতে প্রায় ১০ লক্ষ টাকার মতো লাগতে পারে।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আবু তাহের ভূঁইয়া জানান, উপজেলার ১২৬টি
প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। তন্মধ্যে ৫২টি বিদ্যালয় পানিবন্দি অবস্থায় ছিল। ১দিন পরে
১৭টি প্রতিষ্টানের পানি নিচে নেমে যায়। ৩৭টি শিক্ষা প্রতিষ্টানের জন্য ৫০ হাজার
আর ১৭টি প্রতিষ্ঠানের ৩০হাজার টাকা করে মোট ২৩ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা ক্ষতির পরিমাণ
নিরুপণ করা হয়েছে।

- Advertisement -

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা.সজীব রায় জানান, বন্যাকবলিত
এলাকায় প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে মেডিক্যাল টিম গঠন করা হয়েছে। বন্যা
পরবর্তী কালাজ¦র, ডেঙ্গু, পাইলেরিয়া, ম্যালেরিয়া, কলেরা, ডায়রিয়া রোগের প্রকোপ
থেকে রক্ষার জন্য নানা বিষয়ক পরামর্শ ও চিকিৎসা প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
বন্যাদূর্গতদের প্রাথমিকভাবে খাবার স্যালাইন,বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট ইত্যাদি বিতরণ করা
হয়েছে। বন্যার পানিতে ২জন প্রাপ্ত বয়স্ক ও ১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

উপজেলা পল্লী বিদ্যুতের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার মো. দেলোয়ার হোসেন জানান,
গত ১৭ জুন সকাল ৮টার দিকে বন্যার পানিবৃদ্ধি পেতে থাকে। পৌর শহর সহ উপজেলার
সবকটি ইউনিয়ন পানিবন্দি ছিল। প্রথম দিন এলাকা চিহ্নিত করে শতকরা ২০ভাগ
মানুষকে বিদ্যুতের আওতায় আনা হয়েছিল। বন্যার পানির প্রবল ¯্রােতে বিদ্যুতের ৪টি
খুঁটি ভেঙে গেছে। ১৫টি খুটি পড়ে গেছে, ২টি ট্রান্সফার ও ৩২টি খুটি পানির
¯্রােতে নিখোঁজ রয়েছে। বিশেষ করে চন্ডিগড় ইউনিয়নের মউ এলাকায় বিদ্যুতের ক্ষতির
পরিমাণ বেশি হয়েছে। প্রায় ৮লাখ টাকার ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে বলে তিনি মনে
করছেন।

দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা(ওসি) মোহাম্মদ শিবিরুল ইসলাম জানান, বন্যার
মধ্যেও আইনশৃংখলা সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। তবে উপজেলা সদরের সাথে
ইউনিয়নগুলির সাথে কমিউনিকেশন ব্যবস্থা জোরদার করনে সকলের সর্বাত্বক
সহযোগিতা কামনা করেণ। গ্রামীণ রাস্তা একেবারে বিপর্যস্ত হয়ে গেছে। দ্রুত রাস্তা
সংস্কার ও মেরামত কল্পে উদ্যোগ গ্রহণ করার আহবান জানান তিনি।

নেত্রকোণা জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহন লাল সৈকত
বলেন, সম্প্রতি বন্যায় দুর্গাপুর উপজেলার ফারংপাড়া এলাকার ১কিলো মিটার ভেঙে
গেছে। সেটি মেরামত করতে প্রায় ১৫-২০ কোটি টাকা লেগে যেতে পারে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম জানান, উপজেলার ৭টি
ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভার প্রায় ১লাখ ৫৬হাজার ৬শ ৭০ জন মানুষ বন্যায় দুর্দশাগ্রস্থ
এবং সেখানকার প্রায় ৩হাজার ৬শ ২০টি পরিবার সাময়িকভাবে গৃহহীন হয়ে পড়েছে
বলে ধারণা করা হচ্ছে। ১১টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৯শ ৬০টি পরিবার অবস্থান করছিল। বন্যার
পানি কমে যাওয়ায় এখন ওইসব আশ্রয়কেন্দ্রে কোন পরিবার অবস্থান করছেন না বলেও
তিনি জানান। নগদ টাকা বরাদ্দ ছিল ৯লক্ষ টাকা। এ পর্যন্ত পানিতে ডুবে মারা যাওয়া
ব্যক্তিদের ১লাখ টাকা আর ৮লক্ষ টাকা শুকনো প্যাকেট খাবার বাবদ খরচ করা হয়েছে। এ পর্যন্ত
বন্যার্তদের মাঝে ১১ মেট্রিক টন চাল,সাড়ে ৫ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা
হয়েছে। দুর্গত এলাকায় ৭টি ইউনিয়নে ৭টি মেডিক্যাল টিম কাজ করছে।

দুর্গাপুর পৌরসভার পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা মো. তওহীদুল ইসলামকে পৌরসভার ক্ষতির
পরিমাণ বিষয়ে জানতে চাইলে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেণনি।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার(ইউএনও)মোহাম্মদ রাজীব উল আহসান জানান,গত ১৭ জুন
বন্যায় উপজেলা ৭টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়। জেলা প্রশাসনের নির্দেশনা মোতাবেক
পরদিন থেকেই আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে আসা হয় অনেকগুলো পরিবারকে। উপজেলার সার্বিক
ক্ষয়-ক্ষতি তথ্য হালনাগাদ করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত ত্রাণ সামগ্রি বিতরণ অব্যাহত রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে ক্ষতির পরিমাণ উল্লেখপূর্বক প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। আশা
করছি দু-একদিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ একটি রির্পোট হাতে পেয়ে যাবো।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক অঞ্জনা খান মজলিস দৈনিক আমাদের সময়কে জানান, বন্যায়
দুর্গাপুর উপজেলায় টোটাল ক্ষতির পরিমাণ চিহ্নিত করার জন্য উপজেলা প্রশাসনকে
নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। উপজেলায় ১১৫ মে.টন চাল ও নগদ ৯লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
১১টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছিল। এখন বন্যার পানি কমতে শুরু করেছে। তবে
গাঁওকান্দিয়া ইউনিয়নের এখনো বেশক’টি এলাকা পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। জেলা
প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরণের সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে। পানিবন্দি লোকজনের
সার্বিক খোঁজ নিতে উপজেলা প্রশাসন নিরলসভাবে কাজ করছে।

আরো পড়ুন: কোরবানি ঈদ সামনে রেখে গরু পরিচর্যায় ব্যস্ত ঠাকুরগাঁওয়ের খামারীরা

- Advertisement -
এই জাতীয় আরও সংবাদ
- Advertisment -

সর্বশেষ সংবাদ

- Advertisment -